Monday
12.18.2017
6:18 AM
Welcome Guest
RSS
 
My site
Main Sign Up Login
বই »
Site menu

Statistics

Total online: 1
Guests: 1
Users: 0

Main » 2014 » July » 6 » যারা নিজ নিজ দেশের চাঁদ অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করে থাকেন তাদের দলীল ও তাঁর জবাব
11:30 AM
যারা নিজ নিজ দেশের চাঁদ অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করে থাকেন তাদের দলীল ও তাঁর জবাব

 

যারা নিজ নিজ দেশের চাঁদ অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করে থাকেন তাদের দলীল ও তাঁর জবাব

 

হাদিসে কুরাইব (রাঃ)

 

বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে সমাজে প্রচলিত এলাকা ভিত্তিক আমলকে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য কিছু সংখ্যক ওলামায়ে কিরাম হাদিসে কুরাইব (রাঃ) নামে প্রসিদ্ধ একটি হাদীসকে দলীল পেশ করেন। উক্ত হাদিসটি নিম্নরূপঃ

 

মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে: উম্মুল ফাযল বিনতুল হারিছ তাকে (কুরাইব) আশ-শামে মুয়াবিয়ার কাছে প্রেরণ করলেন; তিনি বলেন: “আমি আশ-শামে গেলাম এবং তার (উম্মুল ফাযল বিনতুল হারিছ)-এর পক্ষ থেকে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্পাদন করলাম। আশ-শামে তখন রমযান মাস শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমি শুক্রবারেই রমযানের নতুন চাঁদ দেখেছিলাম। মাসের শেষদিকে আমি তখন মদিনায় ফিরে এলাম, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) আমাকে রমযানের নতুন চাঁদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি এটা কখন দেখেছ? আমি বললাম: শুক্রবার রাতে আমরা এটা দেখেছি। তিনি বললেন: তুমি কি এটা নিজে দেখেছ? আমি বললাম: হ্যাঁ, আমি দেখেছি এবং অন্যান্য লোকজনও দেখেছে এবং সিয়াম পালন করেছে, মুয়াবিয়া (রা) ও সিয়াম পালন করেছেন; একথা শুনে তিনি বললেন: কিন্তু আমরা এটা দেখেছি শনিবার রাতে। অতএব আমাদেরকে ত্রিশ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অথবা এটি শাওয়্যালের (নতুন চাঁদ) না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন অব্যাহত রাখতে হবে। আমি বললাম: মুয়াবিয়ার চাঁদ দেখা কি আপনার জন্য যথেষ্ট না? তিনি বললেন: না, কারণ এভাবেই আল্লাহর রাসূল আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন”

 

 

পবিত্র হাদীসটির জবাব

 

সুবিজ্ঞ মুহাদ্দেসীনে কিরাম এবং হানাফী, হাম্বলী ও মালেকী মাযহাবের ইমামগণ অত্র হাদিসে পাককে দলীল হিসেবে গ্রহণ না করে হাদিসটির নিম্নরূপ জবাব দান করেছেন-

 

১। এই কিতাবে “রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নিজ আমল” শিরোনামে পবিত্র মিশকাত শরীফের ১২৭ ও ১৭৪ পৃষ্ঠা থেকে যে তিনটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে তার দ্বারা প্রমাণিত যে, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম একজন মরুচারীর সংবাদকে ভিত্তি করে নিজে রোযা রেখেছেন এবং অন্যদেরকে রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। দূরদূরান্ত থেকে আগত একটি কাফেলার সংবাদের ভিত্তিতে ৩০শে রমযান মনে করে রাখা রোযা নিজে ভঙ্গ করেছেন এবং অন্যদেরকেও ভাঙ্গার নির্দেশ দিয়েছেন।

 

তাহলে যেখানে শরীয়ত প্রবর্তক নিজেই অন্যের সংবাদ গ্রহণ করে রোযা রেখেছেন এবং ঈদ করেছেন, সেখানে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সংবাদ গ্রহণ করলেন, কি করলেন না তা কোন যুক্তিতেই দলীল হতে পারেনা।

 

২। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র আমল বিষয়ক উক্ত হাদীস তিনটি হাদিসে মারফু। (মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কথা ও কাজ), আর কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হাদীস হচ্ছে হাদিসে মাওকুফ। (সাহাবীগণের কথা ও কাজ) অতএব অছুলে হাদীস বা হাদীস ব্যাখ্যার মূলনীতি অনুযায়ী হাদিসে মারফুর মোকাবিলায় হাদিসে মাওকুফ কখনও দলীল হতে পারেনা

 

৩।হাদিসে কুরাইব (রাঃ)-এর মধ্যে

 هكذا امرنا النبى صلى الله عليه وسلم এবং فلانزال نصوم حتى نكمل ثلثين اونراه

বিশেষ উক্তি দু’টি মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নয় বরং অত্র উক্তিদ্বয় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিজস্ব উক্তি। তাই কোন সাহাবীর নিজস্ব উক্তি কখনই কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত এবং মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর নির্দেশ ও আমলের বিপরীতে দলীল হতে পারেনা

 

৪। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু তার উক্তিদ্বয় দ্বারা মূলত ইঙ্গিত করেছেন রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর বাণী-    لاتصوم حتى تروه ولاتفطرو حتى تروه এবং صوموا لرؤيته وافطروا لرؤيته এর দিকে। আর রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম-এর এ বাণীর আমল উম্মতগণ কিভাবে করবেন তা মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম নিজ জীবদ্দশায়ই আমল করে দেখিয়ে গেছেন। তাহলো সকলকে চাঁদ দেখতে হবে না বরং কিছু সংখ্যকের দেখাই অন্যদের দেখার স্থলাভিষিক্ত হবে। অতএব ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর উক্ত উক্তিদ্বয় দ্বারা নিজ নিজ এলাকায় চাঁদ দেখে আমল করতে হবে এ ব্যাখ্যা ঠিক নয়।

 

৫। ছহীহ মুসলিম শরীফের বর্ণনায় কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর চাঁদ দেখার স্বীকৃতি মূলক শব্দ نعم رأيته “হ্যা আমি চাঁদ দেখেছি” কথাটির উল্লেখ থাকলেও তিরমীযী সহ অন্যান্য বর্ণনায় কুরাইব (রাঃ) নিজে চাঁদ দেখেছেন এরকম শব্দের উল্লেখ নেই। ফলে অত্র হাদিসটি مضطربবা মূল ভাষ্য কম-বেশী হওয়ায় স্পষ্ট মারফু হাদিসের বিপরীতে কখনই দলীল হতে পারেনা

 

৬।আল্লামা শাওকানী (রঃ) তার লিখিত “নাইলুল আওতার” গ্রন্থের ৪র্থ খন্ডে উল্লেখ করেছেন যে, “হযরত কুরাইব রাদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সংবাদ এবং শামবাসীর চাঁদ দেখাকে গ্রহণ না করা এটা আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিজস্ব ইজতিহাদ, যা সার্বজনীন আইন হিসেবে প্রযোজ্য নয়”।

 

ইমাম শাওকানী রহমাতুল্লাহি আলাইহী “নাইলুল আওতার” কিতাবে আরও লিখেছেন,

 

“ইবনে আব্বাস রাদি আল্লাহু তায়ালা আনহু, রাসূল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এইকথার দিকে ইঙ্গিত করে থাকতে পারেন ‘রোযা রাখ চাঁদের আবির্ভাবে, ঈদ কর এর (চাঁদের) আবির্ভাবে, যদি সন্দেহ হয় ত্রিশ পূর্ণ কর’। এটাই ছিল নির্দেশ। ইহা একথা বলেনা যে এতটুকু বা এতপরিমান দূরত্ব হিসাব করা উচিত, অথবা সাক্ষ্যটি হওয়া উচিত এতটুকু বা এতপরিমান দূরত্বের মধ্যে”।

 

ইমাম সিদ্দীক হাসান খান (রঃ) তাঁর “রওযাতুন নাদীয়া” গ্রন্থের প্রথম খন্ডের ৩৩১ পৃষ্ঠায় ইমাম শাওকানী (রঃ) এর উক্ত বক্তব্যের প্রতি সমর্থন প্রদান করেছেন।

 

৭। ইবনে আব্বাস রাদি আল্লাহু তায়ালা আনহু যদি স্হানীয় চাঁদ দেখার মতটিকে গ্রহন করতেন তাহলে তিনি (চাঁদ দেখার) ব্যপারটিকে যাচাই করতেন না বরং সাধারনভাবে বলেদিতেন এক এলাকার চাঁদ দেখা অন্য এলাকার জন্য প্রযোজ্য নয়।কিন্তু তিনি তা না করে বরং সংবাদটি যাচাই করেছেন এই প্রশ্নদুটি করে "তুমি এটা কখন দেখেছ? এবং “তুমি কি এটা নিজে দেখেছ?”

 

৮।আল্লামা ইবনু হুমাম (রঃ) ফতহুল কাদীরে এবং আল্লামা ইবনু নাজীম (রঃ) বাহরুর রায়েক-এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন যে, পরিষ্কার আকাশে পবিত্র রমযানের চাঁদ দেখা প্রমাণিত হওয়ার জন্য শরয়ী পদ্ধতি হচ্ছে ৪টি। একঃ দু’জন আকেল, বালেগ ও স্বাধীন মুসলিম সাক্ষ্য দিবে, দুইঃ উক্ত গুণে গুণান্বিত দু’জন, অনুরূপ দু’জনের চাঁদ দেখার প্রতি সাক্ষ্য দিবে। তিনঃ অনুরূপ গুণে গুণান্বিত দু’ ব্যক্তি চাঁদ দেখায় কাজীর ফয়সালার প্রতি সাক্ষ্য দিবে। চারঃ চাঁদ দেখার খবর মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রচার পেয়ে দৃঢ়তার পর্যায়ে এমন ভাবে পৌঁছে যাবে যাকে মিথ্যা বলে ধারণা করা যায়না।

 

 কিন্তু শামবাসীর চাঁদ দেখার সংবাদ কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু কর্তৃক অত্র চার পদ্ধতির কোন পদ্ধতিতেই ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিকট উপস্থাপিত হয়নি। তাই শরয়ী বিচারে তিনি উক্ত সংবাদ গ্রহণ করেননি।

 

৯। আল্লামা ইবনু ক্বুদামাহ্‌ (রঃ) তার মুগণী কিতাবে এবং শাইখুল হিন্দ হোসাইন আহমদ মাদানী (রঃ) মায়ারিফুল মাদানিয়া-এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন যে, যদিও ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সাথে কুরাইব রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর আলোচনা হয়েছিল রমজানের চাঁদ দেখা নিয়ে কিন্তু এর প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া পড়ছিল অত্যাসন্ন ঈদুল ফিতরের উপর। কারণ উক্ত হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কুরাইব রাদি আল্লাহু তায়ালা আনহু রমযানের শেষের দিকে শাম থেকে মাদিনায় এসে ছিলেন। আর শরীয়তের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কমপক্ষে দু’জনের সাক্ষী ছাড়া রোযা ছেড়ে ঈদ করা যায়না। তাই ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু একজনের সাক্ষ্য গ্রহণ না করে বলেছিলেন- هكذا امرنا النبى صلى الله عليه وسلم এবং  فلانزال -نصوم حتى نكمل ثلثين اونرا

[(দেখুনঃ তানযীমুল আশতাত, খন্ড-২, পৃঃ-৪১, মিফতাহুন্নাজ্জাহ, খন্ড-১, পৃঃ-৪৩২,মায়ারিফুল মাদানিয়া, খন্ড-৩, পৃঃ-৩২-৩৫)]

 

১০। হযরত ইবনু আব্বাস রদি আল্লাহু তায়ালা আনহু-এর আমলকে দলীল গ্রহণ করে, যে সকল পূর্ববর্তী আলেমগণ এলাকা ভিত্তিক আমলের সপক্ষে মতামত দিয়েছেন তারা প্রায় সকলেই একথা বলেছেন যে, নিকটবর্তী দেশ বা অঞ্চলে চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় হবে না। এক স্থানের দেখা দ্বারাই সকল স্থানে আমল করতে হবে। আর যদি চাঁদ দেখার দেশটি চাঁদ না দেখার দেশ থেকে অনেক দূরে হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে যার যার দেখা অনুযায়ী আমল করতে হবে। একটু গভীর ভাবে লক্ষ্য করলে সকলের নিকটই একথা সূর্যালোকের মত পরিষ্কার যে, এক দেশের চাঁদ দেখার সংবাদ অন্য দেশ থেকে গ্রহণ করা না করার দিক থেকে ঐ সকল সম্মানিত ওলামাই কিরাম পৃথিবীকে নিকটবর্তী ও দূরবর্তী এ দু’ভাগে ভাগ করার কারণ হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা। তাদের যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে তাদের এ মতামত ঐ যুগের জন্য যুক্তিযুক্ত এবং যথার্থ ছিল। কিন্তু পূর্ববর্তী সম্মানিত ওলামাই কিরামের ঐ মতামত বর্তমানে দু’টি, কারণে গ্রহণ যোগ্য নয়।   এক: যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে বর্তমান পৃথিবীর বিপরীত মেরুর দেশ দু’টিও তাদের যুগের পাশাপাশি অবস্থিত দু’টি জেলা শহরের চেয়েও অধিক নিকটবর্তী। সুতরাং আজকের যোগাযোগ ব্যবস্থায় দূরবর্তী দেশ বলতে আর কোন কথা নেই। দুই: তারা যে ওজর বা বাধ্যবাধকতার কারণে এ মতামত দিয়েছেন আজকের বিশ্ব ব্যবস্থায় সে ওজর সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

 

১১।  ইমাম যায়লায়ী (রহঃ) যিনি নিজ নিজ দেশে বা এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে চাঁদ দেখে সেই অনুযায়ী পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন বারে রোজা ও ঈদ পালন করার ব্যপারে মত প্রকাশ করেছেন, তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে বেশীর ভাগ ফকীহ বা ফিকাহবিদ সারা পৃথিবীতে একই দিনে রোযা শুরু ও সারা পৃথিবীতে একই দিনে ঈদ করার মত গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তার সমসাময়ীক সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে চাঁদ উদয়ের সংবাদ দেয়া-নেয়ার সমস্যার সমাধান কল্পেই তিনি নিকটবর্তী দেশ এবং দূরবর্তী দেশ অনুসরণের ফাতওয়া দিয়েছিলেন। বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থার কোন অসুবিধা না থাকায় সম্মানিত ইমামগণের কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক মূল সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমলের কোন বিকল্প নেই।

 

১২। বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের সাবেক সভাপতি মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহিল কাফী আল কুরাইশী (রঃ) হাদীসে কুরাইব সম্পর্কে লিখেছেন,

 

“রাসূলুল্লাহ (দঃ) কি আদেশ করিয়াছেন, ইবনে আব্বাস তাহা উল্লেখ করেন নাই, রাসূলুল্লাহর (দঃ) আদেশের যে তাৎপর্য তিনি উপলদ্ধি করিয়াছেন, তিনি কেবল তাহাই উল্লেখ করিয়াছেন, সুতরাং এক প্রদেশের রূয়ত অন্য প্রদেশের জন্য প্রযোজ্য না হওয়া হযরত ইবনে আব্বাসের নিজস্ব ইজতিহাদ মাত্র। রাসূলুল্লাহর (দঃ) নির্দেশ ইমাম আহমাদ, মুসলিম ও তিরমিযি প্রভৃতি ইবনে উমর ও আবু হুরায়রার (রাঃ) বাচনিক রেওয়ায়েত করিয়াছেন:

 

হিলাল (চাঁদ) দর্শন করার পর রোযা রাখিবে আর উহা দর্শন করিয়া ফিতর (ঈদ) করিবে, যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়, তাহা হইলে দিন গণনা করিবে”। অন্য রেওয়ায়েতে আছে, রাসূলুল্লাহ (দঃ) বলিলেন, “আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইলে ত্রিশের সংখ্যা পূর্ণ করিবে”। [(বুখারী (১) ২১৫, মুসলিম (১) ৩৪৭, তিরমিযী (২) ৩৪ পৃঃ)]

 

রাসূলু্ল্লাহর এই আদেশ ব্যাপক, কোন অঞ্চল বা ভূভাগকে তাঁর আদেশে সীমাবদ্ধ করা হয় নাই সুতরাং একস্হানের রূয়ত (দেখা) দ্বারা সকল স্হানে উহার বিধান বলবৎ করার আদেশ অধিকতর স্পষ্ট এবং নস্সের ব্যাপক আদেশকে ইবনে আব্বাসের ইজতিহাদ সীমাবদ্ধ করিতে সক্ষম নয়।

 

বুখারী ও মুসলিমের উল্লিখিত হাদীস প্রসঙ্গে ইমাম শাওকানী লিখিয়াছেন:

 

“রাসূলুল্লাহর (দ:) আদেশ আঞ্চলিক বিভিন্নতার জন্য পৃথক পৃথক হয় নাই, সকল মুসলমান উক্ত আদেশে সম্বোধিত হইয়াছেন, সুতরাং এক নগরের রূয়ত অন্য নগরের প্রতি প্রযোজ্য হইবার ব্যবস্থা – না হইবার ব্যবস্থা অপেক্ষা সুস্পষ্ট। কারণ এক শহরের মুসলমানের চন্দ্র দর্শন সকল মুসলমানের দর্শনের অনুরূপ, সুতরাং সেই শহরের মুসলমানগণের উপর যাহা প্রযোজ্য হইবে, অপর স্হানের মুসলমানদের উপর ও তাহা বলবৎ হইবে”। (ইমাম শাওকানীর কথা এপর্যন্তই এখানে দেয়া হয়েছে) [(নাইলুল আওতার)]

 

তারপর এক শহরের রূয়ত (দেখা) অন্য শহরের জন্য অনুসরণীয় না হওয়াই যদি ইবনে আব্বাসের ইঙ্গিতকৃত হাদীসের তাৎপর্য হয়, তাহা হইলে দূরত্বের পরিমাণ এবং মত্লার পার্থক্য ইত্যাদি বিষয় সম্বন্ধে উহাতে কোন উল্লেখ নাই। আবার ইহাও লক্ষ্য করার বিষয় যে শাম ও মদীনার দূরত্ব এত দূর নয় যাহাতে মতলার পার্থক্য ঘটিতে পারে, সুতরাং ইবনে আব্বাসের শামের রূয়ত অস্বীকার করার হেতুবাদ তাহার ইজতিহাদ মাত্র”। (মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহিল কাফী আল কুরাইশী (রঃ) এর কথা এপর্যন্তই এখানে দেয়া হল) 

 

মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহিল কাফী আল কুরাইশী (রঃ) আরও লিখেছেন,

 

“ইবনে আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহর (সঃ) বাচনিক এমন কোন হাদীস রেওয়ায়েত করেন নাই, যদ্বারা আমরা বিবেচনা করিয়া দেখিতে পারি যে, উহা হযরতের (সঃ) ব্যপক আদেশকে সীমাবদ্ধ করিতে পারে কিনা। সর্বশেষ কথা এই যে, ইবনে আব্বাসের ইজতিহাদকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর ব্যপক আদেশের সংকোচক বলিয়া মানিয়া লইলে বেশীর বেশী এইটুকু সাব্যস্ত হইতে পারে যে, মদীনা হইতে দামেশকের দূরত্ব যতখানি ততখানি দূরত্বে অবস্থিত কোন শহরের রূয়ত অন্য শহরের উপর প্রযোজ্য নয়, কিন্তু ইবনে আব্বাসের (রাঃ) ইজতিহাদকে মারফু হাদীসের সংকোচক স্বীকার করার উপায় নাই

 

ইমাম কুরতুবী তাঁহার উস্তাদগনের উক্তি উদ্ধৃত করিয়াছেন যে,

 

“এক নগরীর অধিবাসীরা হিলাল দর্শন করিলে সকল প্রদেশের অধিবাসীগণের জন্য উহা অনুসরণীয় হইবে ইহাই ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালিক এবং ইমাম আহমাদের সিদ্ধান্ত”।(ইমাম কুরতুবীর কথা এপর্যন্তই এখানে দেয়া হয়েছে) [গায়াতুল আমানী (৯) ২৭২ পৃষ্ঠা]

 

রাসূলুল্লাহর (দঃ) স্পষ্ট নির্দেশের সহিত এই সিদ্ধান্তই সুসামঞ্জস্য এবং আমরা ইহাকেই অনুসরণযোগ্য মনে করি।” (মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহিল কাফী আল কুরাইশী (রঃ) এর কথা এপর্যন্তই এখানে দেয়া হল) 

 

১৩। যদি সকল তর্ক-বিতর্ক বাদ দিয়ে হাদিসে কুরাইব-এর ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে রোযা ও ঈদ মেনে নেওয়া হয় এবং রোযা, ঈদ, কুরবানীসহ চাঁদের তারিখ সংশ্লিষ্ট ইবাদাত সমূহ সমগ্র বিশ্বে একই দিনে অনুষ্ঠিত না হয় তাহলে এমন সব জটিল সমস্যার সৃষ্টি হয় যার কোন সমাধান নেই। নিম্নে এরকম প্রধান প্রধান কিছু সমস্যা তুলে ধরা হল-

 

(১) বাংলাদেশে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সমূহের ( যেমন সৌদি আরব, ইয়েমেন, ওমান, ইরাক, কুয়েত, জর্দান ইত্যাদি দেশের ) একদিন পরে সিয়াম / রোজা শুরু করলে, বা বাংলাদেশে মধ্যপ্রাচ্যের একদিন পরে ঈদ করলে এই অবস্হা হয়: বাংলাদেশ থেকে কেউ রোযা শুরু করে রমযান মাসের যে কোন দিন মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে সেখানে ঈদ করলে তার রোযা ২৮ বা ২৯ টি হয় অর্থাৎ অন্যদের চেয়ে একটি কম হয়, আবার মধ্যপ্রাচ্য থেকে কেউ রোযা শুরু করে রমযান মাসের যে কোন দিন বাংলাদেশে এসে ঈদ করলে তার রোযা ৩০ বা ৩১ টি হয় অর্থাৎঅন্যদের চেয়ে একটি বেশি হয়। অথচ ২৮ বা ৩১ রোজার বিধান ইসলামে নাই। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে আরবী মাস ২৯-এর কম হবেনা এবং ৩০-এর বেশী হবেনা। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ঈদের দিন রোযা রাখা হারাম। ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে রোযা ও ঈদ মেনে নিলে এই২৮ বা ৩১ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

 

(২) ৩০ পারা কুরআন একত্রে লওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে নাযিল করা হয়েছে এক রাতেই। দুই রাতে নয়। ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে রোযা ও ঈদ মেনে নিলে কুরআন নাযিলের রাত বা লাইলাতুল কদর দুটি হয়ে যায় যা কখনোই সম্ভব নয় কারন সমগ্র কুরআন একত্রে দুই রাতে নাযিল হয়নি

 

(৩) জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা, মূল শয়তানকে বন্দি করা এগুলি দুই দিনে দুই বার নয় বরং এক বারই হয়ে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে রোযা ও ঈদ মেনে নিলে এগুলি একাধিক বার হয় বলে মেনে নিতে হয় যা বিবেকগ্রাহ্য নয়

 

(৪) রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন যে, “আরাফার দিনে রোযার ব্যাপারে আমি আল্লাহর নিকট আশা রাখি, তা পূর্ববর্তী বছর এবং পরবর্তী বছরের গুনাহ্‌ মুছে দিবে (বা ঐ দিনের রোযার বিনিময়ে আল্লাহ পাক রোযাদারের পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহ্‌ ক্ষমা করে দেন)”। [(মুসলিম শরীফ, অধ্যায় সাওম, হাদীস নং ২৬০২ ও ২৬০৩, অথবা অধ্যায় ৬, হাদীস নং ২৬০২ ও ২৬০৩) অথবা (মুসলিম শরীফ, অনুবাদ – আ.স.ম. নুরুজ্জামান, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১১১ - ১১২, অধ্যায় ১৪ - কিতাবুস সাওম, হাদীস নং ২৬১২ ও ২৬১৩)]

 

আরাফার দিন হচ্ছে সেটাই যেদিন হাজীগন আরাফার মাঠে থাকেন। ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে রোযা ও ঈদ মেনে নিলে আরাফার দিন দুটি হয়ে যায় অথচ আরাফার দিন একটাই

 

(৫) চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা অনুযায়ী নিশ্চিতভাবে সঠিক স্হায়ী সীমানা নির্ধারন করা যায়না। কারন উদয় স্থল সর্বদা একই রকম থাকেনা। যে কোন বছরে যে কোন মাসের চাঁদ পৃথিবীতে প্রথম উদিত হলে যে এলাকাসমূহ তার আওতাভূক্ত থাকে তার সীমানা প্রতিমাসে একরকম থাকেনা, প্রতি বছরেও একরকম হয়না। তারপরেও যদি চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতার ভিত্তিতে পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকার সীমানা নির্ধারন করে একই দিনে সেই সীমানার এক পাশে রোযা অন্য পাশে ঈদ হয়, তবে সেই সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ কি রোযা করবে নাকি ঈদ করবে এর কোন সমাধান পাওয়া যায়না

 

(৬) চাঁদ দেখার সংবাদ যদি নিকটবর্তি এলাকায় গ্রহণ করা হয় আর দূরবর্তি এলাকায় গ্রহণ না করা হয় তাহলে যে এলাকাকে সর্বশেষ নিকটবর্তি এলাকা মনে করে সংবাদ গ্রহণ করা হচ্ছে আর তার একেবারে পাশের এলাকাকেও দূরবর্তি মনে করে সংবাদ গ্রহন করা হচ্ছে না, এই দুই এলাকার সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ সংবাদ গ্রহণ করবে কিনা এর কোন সমাধান পাওয়া যায়না

 

(৭) “চাঁদ দেখার নির্ভরযোগ্য সংবাদ সর্বোচ্চ কতদূরত্বের মধ্য থেকে আসলে তা গ্রহনযোগ্য হবে” অথবা “সর্বনিম্ন কতটুকু দূরত্বের বাইরের চাঁদ দেখার নির্ভরযোগ্য সংবাদ গ্রহনযোগ্য হবে না” তার নির্ধারিত কোন পরিমান কুরআনের আয়াত বা রাসূল (সাঃ) এর হাদীসে পাওয়া যায় কি??? (এই দূরত্বের সঠিক পরিমানের কথা উল্লেখ আছে এমন কোনো কুরআনের আয়াত বা রাসূল (সাঃ) এর হাদীস অধম লেখকের ক্ষুদ্রতম জ্ঞানে জানা নাই। সম্মানিত পাঠক, এমন কোনো কুরআনের আয়াত বা রাসূল (সাঃ) এর হাদীস পেলে, অধম লেখককে জানানোর বিনীত অনুরোধ রইল।)

 

(৮) হারাম জাতিয়তাবাদী বর্ডার বা দেশের সীমারেখা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন দিনে রোযা শুরু বা ভিন্ন ভিন্ন দিনে ঈদ মুসলিমরা কেন করবে? দেশে দেশে এই সীমান্ত তো মানুষের তৈরী, আল্লাহর দেয়া নয়, তাহলে ব্রিটিশের দেয়া বর্ডার অনুযায়ী কেন মুসলিমরা ভিন্ন ভিন্ন বারেরোযা শুরু করবে, আর কেনইবা ভিন্ন ভিন্ন বারে ঈদ করবে?? আফগানিস্তান ও পাকিস্তান একেবারে পাশাপাশি এবং একটাই মুসলিম ভূমি। অথচ আফগানিস্তানের সরকারী ঘোষনা অনুযায়ী যেদিন ঈদুল ফিতর হয়, সাধারনত পাকিস্তানের সরকারী ঘোষনা অনুযায়ী তার পরদিন ঈদুল ফিতর হয়। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান একটাই মুসলিম ভূমি হওয়া স্বত্তেও হারাম জাতিয়তাবাদী বর্ডার বা দেশের সীমারেখার কারনে সরকারী ঘোষনা অনুযায়ী আফগানিস্তানে যেদিন ঈদুল ফিতর হচ্ছে পাকিস্তানে সেদিন রোজা হচ্ছে। অথচ ঈদের দিন রোযা রাখা হারাম। কি আশ্চর্য্য! একই ভূমিতে একই মুসলিম জাতি একই দিনে সরকারী ঘোষনা মানতে গিয়ে ব্রিটিশের দেয়া বর্ডার বা সীমান্ত অনুযায়ী সীমান্তের এক পাশে ঈদ আর অন্য পাশে রোজা করতে বাধ্য হচ্ছে!! হায়রে মুসলিমদের অবস্হা!! পৃথিবীর সমস্ত মুসলিম একই জাতি হওয়াস্বত্তেও ব্রিটিশের ভাগ করা সীমান্ত, আলাদা আলাদা হারাম জাতিয়তাবাদী পতাকা, হারাম জাতিয়তাবাদী দালাল সরকার এইসবের কারনে ৫৭ টুকরায় বিভক্ত হয়ে আছে, এমনকি রোযা ঈদ পর্যন্তও এগুলি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে!! বৃটিশরা দাগ টেনেছে মাটিতে, আর কিছু মুসলিম সেই দাগ আকাশেও টেনে বলছে, আমার দাগের ভিতরে চাঁদ আসলে এটা আমার চাঁদ, তোমার দাগের ভিতরে আসলে তোমার চাঁদ! কি ভয়ংকর জাতিয়তাবাদ!!

 

রাসূল (সঃ) বলেন, “সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয় যে জাতিয়তাবাদের দিকে আহবান করে, জাতিয়তাবাদের জন্য যুদ্ধ করে বা জাতিয়তাবাদের জন্য মারা যায়” [(আবু দাউদ)]

 

রাসূল (সঃ) আরও বলেন, “যে আসাবিয়্যার (অর্থাৎ জাতীয়তাবাদের) জাহেলী আহবানের দিকে মানুষকে ডাকে সে যেন তার পিতার লজ্জাস্হান কামড়ে ধরে পড়ে আছে (তাকে ছাড়তে চাইছে না) । (এরপর রাসূল সাঃ বলেন) এবং একথাটি লুকিয়ে রেখোনা (অর্থাৎ বলার ক্ষেত্রে কোনো লজ্জা বা অস্বস্তি বোধ করোনা)”। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২১২৩৩]

 

সুতরাং কোনো জাতি রাষ্ট্রের সীমানা অনুযায়ী মুসলিম উম্মত বিভক্ত হওয়া হারাম। শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রত্যেক মুসলিম পরস্পর ভাই ভাই এবং তাদের ভূমিগুলো একই ভূমি হিসেবে বিবেচিত হয়।

Views: 467 | Added by: Sabuz | Tags: রোজা, Unity, Global Moon Sighting, ঐক্য, হাদিসে কুরাইব (রাঃ), একই দিনে রোযা একইদিনে ঈদ, রমজান, Moon sighting | Rating: 0.0/0
Total comments: 0
avatar
Login form

Search

Calendar
«  July 2014  »
SuMoTuWeThFrSa
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031

Entries archive

Site friends
  • Create a free website
  • uCoz Community
  • uCoz Textbook
  • Video Tutorials
  • Official Templates Store
  • Best Websites Examples